ইতিহাস ধরে রাখার সিনেমা ‘ফাগুন হাওয়ায়

ইতিহাসের গল্প নিয়ে ফাগুন হাওয়ায়। ইতিহাস তো বাস্তবেরই নির্মোহ বয়ান মাত্র; ফাগুন হাওয়ায় পুরোপুরিই বাস্তবের নির্মোহ বয়ান তাই।

আর ইতিহাস বলার চমকপ্রদ ঢঙের কারণে দর্শকদের ভাল লাগায় থাকবে ফাগুন হাওয়া।

সবচে বড় কথা আমাদের চলচ্চিত্র যে ধীরে ধীরে একটা মেজাজে পৌঁছাচ্ছে, সেটা ভাল করে বুঝিয়ে দিচ্ছে ফাগুন হাওয়ায়।

আমাদের সমাজ বায়ান্নর পর থেকে থেকে পিছিয়েছে। বায়ান্নতে ভাষার প্রশ্নে যে মুসলমান বাঙালি হতে পেরেছিল, সে বাঙালি এখন এসে শুধু মুসলমান হওয়াতেই তার জীবনের স্বার্থকতা খুঁজছে।

লালনের গান গাইবার অপরাধে বায়ান্নতে যেমন বাউলের মাথা ন্যাড়া করে দেওয়া হতো, এখনো আমরা তাই করছি। তাহলে আমরা এগিয়েছি এমন দাবি করার সুযোগ আমাদের থাকছে কী? সিনেমাটি এ জায়গাটায় আমাদের আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড় করায়।

একবার একই রেলযাত্রায় পেয়েছিলাম ভাষা মতিন বলে খ্যাত সৈনিক শ্রদ্ধেয় আব্দুল মতিনকে।

গ্রামের সাধারণ মানুষ স্বপ্ন দেখেন কোন ভাষায়? স্বভাবতই মানুষ বাংলা ভাষায় স্বপ্ন দেখার কথাই বলেছিলো বায়ান্নতে।

আর স্বপ্ন যেহেতু বাংলা ভাষায় দেখেছে কাজেই বাংলাও উপরওয়ালারই ভাষা। এমন করেই সাধারণকে বাংলা ভাষা যে হিন্দুর ভাষা নয়, ভাষার যে ধর্ম হয় না, সে কথা বোঝাতে হয়েছিল।

মায়ের ভাষা বাংলা ভাষার ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠার আন্দোলন সংগঠনের কথা সেদিনের সেই রেলযাত্রায় এভাবেই জানিয়েছিলেন শ্রদ্ধেয় এই ভাষা সৈনিক ।

সিনেমা দেখতে দেখতে তার ওই কথাগুলোই ঘুরেফিরে মনে হচ্ছিল । ভাষার তো ধর্ম হয় না। পৃথিবীর কোনো ভাষাই পৃথিবীর কোনো ধর্ম পালনে বাধার কারণ হতে পারে না।

এই সত্য বায়ান্নতে বুঝতে পেরেছিল বলেই বাংলার জন্য রক্ত দিয়েছিলো বাঙালি।

অথচ এখনকার মানুষ সব কিছুর সাথে ভাষার প্রশ্নেও যেভাবে ধর্মকে টেনে আনছে, যেভাবে লালনের গান করার অপরাধে বাউলদের মাথা ন্যাড়া করে দিচ্ছে, সেই মানুষের সমাজ এগিয়েছে সেটা কোনোভাবেই বলা যায়না।

বদরুদ্দীন উমর ভাষা আন্দোলনকে বাঙালি মুসলমানের ঘরে ফেরার আন্দোলন বা বাঙালি হবার আন্দোলন বলেছিলেন।

ভাষার জন্য রক্ত দেওয়া বাঙালি এখন কোথায় এসে দাঁড়িয়েছে তা ফাগুন হাওয়ায় সিনেমার আয়নায় ধরা পড়েছে।

তবে কিছুটা সমালোচনাও জমা করতে হবে এই সিনেমার ঝুলিতে। গল্পটা যেহেতু বাস্তবের সেহেতু এর নির্মাণে আরো বেশি যত্নবান হওয়া উচিত ছিল।

দুয়েকবার হলেও সিনেমা দেখার সময় বায়ান্নর আগের সময়কালে আছি না ২০১৯ সালে চলে এসেছি, সে অস্বস্তি নাড়া দিয়েছে মনকে।

গল্পের নায়ক নাসির যখন তার মাকে পুরনো ছবি উদ্ধারের কথা জানাতে ছবি ‘রিস্টোর’ করার কথা বলে তখন তখন মনে হয়েছিল ঘটনা এখনকার।

বায়ান্ন পূর্ব সময়ে কেউ ইংরেজি রিস্টোর শব্দ ব্যবহার করে ছবি উদ্ধারের কথা তার মাকে বলবে এটা একেবারেই বেমানান।

নায়িকা দীপ্তির ঠাকুরদার বাড়িটি ও অন্দরমহলের ঠাটবাট আর যাই হোক বায়ান্নর আগের সময়ের মনে হয়নি। বরং একেবারেই সমসাময়িক লেগেছে।

নায়িকা দীপ্তির সাথে ডাক্তারের সম্পর্কটা ঠাকুরদা ও নাতনির। পুরো সিনেমায় নায়িকা দীপ্তি শুদ্ধ উচ্চারণে ঠাকুরদা-ঠাকুরদা করে ডেকেছে।

কথ্য উচ্চারণে বা দৈনন্দিন জীবনে কাউকে এতো শুদ্ধভাবে ঠাকুরদা ডাকতে আমি শুনিনি। ঠাকুদ্দা বা দাদু বা আরো সংক্ষেপে শুনেছি হরদম। শুদ্ধ ও স্পষ্ট ঠাকুরদা উচ্চারণ আরোপিত ও শ্রুতিকটু লেগেছে। কথ্য বা সংক্ষেপিত উচ্চারণই সুখ দিতো দর্শক -শ্রোতাকে।

নাসির-মঞ্জু ভাইদের মুরগি পুুড়িয়ে খাবার আয়োজনটাও সেকেলে মনে হয়নি। একালের মানুষ যেভাবে বারবিকিউ করে অনেকটা তেমনই লেগেছে।

নায়ককে হিন্দু আর নায়িকাকে মুসলমান দেখাবার ঝুঁকি সম্ভবত এপার বাংলার কোনো গল্পকার বা পরিচালকই নেবেন না। তৌকির আহমেদও নেননি। প্রথাগত হিন্দু নায়িকা আর মুসলমান নায়কেই লগ্নিকারককে ঝুঁকিমুক্ত রাখা হয়েছে ।

যদিও এই সব সামান্য নির্মাণ বিচ্যুতি ও প্রথাগত প্রবণতার চর্চা সিনেমার গুরুত্ব কমায় না। আবারো বলতে হচ্ছে, এর গল্প দর্শককে বায়ান্নর সাথে আপনার এখনকার সমাজের হুবহু মিল পাইয়ে দেবে অনেকাংশে।

আমাদের পড়াশোনা এখন শূন্যের কোঠায় পড়লেও সেটা লক্ষ্য কেন্দ্রিক। রুটি-রুজির কাজে না লাগলে সেটা আমরা পড়তে চাই না।

ইতিহাস ও ত্যাগের বয়ান তাই আমাদের আর ভাল লাগেনা। রক্ত দেওয়া ভাষা আন্দোলন তাই আজ শহীদ মিনারে বছরে একদিনের ফুল দেওয়ার আনুষ্ঠানিকতা মাত্র।

যখন বড় পর্দায় বায়ান্ন সালে বাউলের মাথা ন্যাড়া করে দেবার সাথে এখনকার সময়ে কুষ্টিয়ার বা সারাদেশের বাউলদের মাথা ন্যাড়া করবার মিল দেখবেন, যখন দেখবেন বায়ান্নর মতই বাংলাকে হিন্দুয়ানি ভাষা হিসেবে বাংলা বলার অপরাধে বর্তমানেও আপনাকে বিভ্রান্ত অপরাধবোধে ভোগাতে চাইবার লোকের অভাব হবেনা তখন আপনি হয়ত থমকে যাবেন।

আর এখানেই ‘ফাগুন হাওয়ায়’ সিনেমাটি সফল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *